মানুষের মনের ভাব প্রকাশের প্রধান বাহন হলো ভাষা, আর সেই ভাষার প্রাণশক্তি হলো শব্দ। একটি সমৃদ্ধ শব্দভাণ্ডার কেবল কথা বলার দক্ষতা বাড়ায় না, বরং মানুষের চিন্তাশক্তি ও ব্যক্তিত্বকেও শাণিত করে। আমরা যত বেশি শব্দের সাথে পরিচিত হই, আমাদের ভাব প্রকাশের জগত ততটাই বিস্তৃত ও বৈচিত্র্যময় হয়ে ওঠে। তাই সার্থক যোগাযোগ এবং জ্ঞানার্জনের পথে শব্দভাণ্ডার বৃদ্ধি করা কোনো কঠিন কাজ নয়, বরং এটি নিয়মিত অভ্যাসের মাধ্যমে আয়ত্ত করার মতো একটি চমৎকার শিল্প।
বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি, সরকারি চাকরি কিংবা GRE/IELTS-এর মতো আন্তর্জাতিক পরীক্ষা – সবক্ষেত্রেই শব্দভাণ্ডার বাড়ানোর জন্য Princeton Review-এর ‘Word Smart’ বইটি বিশ্বজুড়ে সমাদৃত। এই লেখায় আমরা সেই বিখ্যাত বইটির আলোকেই নতুন শব্দ শেখার কার্যকর কিছু কৌশল নিয়ে আলোচনা করব।
নতুন শব্দ কীভাবে শিখবো?
- শিশুদের মতো সহজাতভাবে শেখা :
শিশুরা বড়দের অনুকরণ করে এবং কথা বলার প্রয়োজনে নতুন শব্দ শেখে। তারা কোনো কঠিন শব্দ শুনলে বারবার তা ব্যবহারের মাধ্যমে আয়ত্ত করে। প্রাপ্তবয়স্কদেরও উচিত নতুন শব্দ এড়িয়ে না গিয়ে তার চারপাশের বাক্য বা প্রসঙ্গ থেকে অর্থ বোঝার চেষ্টা করা। অর্থাৎ, শব্দের প্রতি কৌতূহলী হওয়া প্রয়োজন।
- ব্যবহারের মাধ্যমেই শব্দ মনে থাকে :
একটি নতুন শব্দ কেবল জানলেই হয় না, সেটিকে নিজের শব্দভাণ্ডারে স্থায়ী করতে নিয়মিত ব্যবহার করতে হবে। ভুল হওয়ার ভয় থাকলেও স্কুল, কর্মক্ষেত্র বা আড্ডায় নতুন শব্দটি বারবার ব্যবহার করুন। সমৃদ্ধ শব্দভাণ্ডার কেবল কথা বলা বা লেখার মানই উন্নত করে না, বরং উচ্চশিক্ষা অর্জন এবং ক্যারিয়ারের সাফল্যেও বড় ভূমিকা রাখে।
- পড়ার কোনো বিকল্প নেই :
নতুন শব্দ শেখার শ্রেষ্ঠ উপায় হলো প্রচুর পরিমাণে পড়া। আপনি যত বেশি ভালো বই, ম্যাগাজিন বা পত্রিকা পড়বেন, আপনার মস্তিষ্ক তত বেশি নতুন শব্দের সংস্পর্শে আসবে এবং নিজে থেকেই সেগুলো আয়ত্ত করে নেবে। এক্ষেত্রে ভিডিও কনটেন্ট দেখার চেয়ে টেক্সট পড়ার অভ্যাস শব্দভাণ্ডার বাড়াতে অনেক বেশি কার্যকর।
- অভিধান ব্যবহারের প্রয়োজনীয়তা :
অনেকে কেবল বাক্যের প্রসঙ্গ দেখে অর্থ অনুমান করেন, তবে এতে কিছু ঝুঁকি থাকে। কারণ অন্য কেউ শব্দটি ভুলভাবে উচ্চারণ বা ব্যবহার করতে পারে। এছাড়া অনেক শব্দের একাধিক অর্থ থাকে যা প্রসঙ্গ দেখে সবসময় বোঝা যায় না। ভুল অর্থ শেখা এড়াতে সবসময় একটি ভালো অভিধানের সাহায্য নেওয়া উচিত। সাধারণ ব্যবহারের জন্য ভালো মানের একটি ‘কলেজ এডিশন’ অভিধানই যথেষ্ট। বর্তমানে স্মার্টফোন অ্যাপ বা বহনযোগ্য ছোট অভিধান হাতের কাছে রাখা সহজ। তবে গবেষণায় দেখা গেছে, ছাপানো কাগজের অভিধানে শব্দ খুঁজলে তা মনে রাখার সম্ভাবনা বেশি থাকে। দিনশেষে আপনি যে মাধ্যমেই শব্দ খুঁজুন না কেন, মূল উদ্দেশ্য হলো নতুন শব্দের সঠিক অর্থ গেঁথে নেওয়া।
- থিসরাসের সঠিক ব্যবহার :
থিসরাস হলো এমন একটি রেফারেন্স বই যেখানে অনেক শব্দের সমার্থক শব্দ বা প্রতিশব্দ দেওয়া থাকে। শব্দভাণ্ডার সমৃদ্ধ করার অভিযানে এটি একটি চমৎকার হাতিয়ার হতে পারে, তবে শর্ত হলো এর সঠিক ব্যবহার জানতে হবে। দুর্ভাগ্যবশত, অনেকেই এর অপব্যবহার করেন। অনেক শিক্ষার্থী তাদের লেখাকে পাণ্ডিত্যপূর্ণ দেখাতে এবং নিজেদের শব্দভাণ্ডারকে আসলে যা তার চেয়ে বড় করে তুলে ধরতে থিসরাস থেকে কঠিন কঠিন শব্দ বেছে নিয়ে লেখায় ব্যবহার করে তারা প্রথমে সাধারণ ভাষায় লেখা শেষ করে, এরপর থিসরাস দেখে সেখানে জটিল শব্দগুলো বসিয়ে দেয়। এটি মোটেও সঠিক পদ্ধতি নয়। সঠিকভাবে ব্যবহার করলে থিসরাস অবশ্যই অত্যন্ত কার্যকর। এটি ব্যবহারের শ্রেষ্ঠ উপায় হলো একে অভিধানের সহায়ক হিসেবে গ্রহণ করা। আপনি মনে যা বলতে চাইছেন, তা ঠিক কতটুকু সূক্ষ্মভাবে এবং সুনির্দিষ্টভাবে প্রকাশ করা যায়—সেই সঠিক শব্দটি খুঁজে পেতেই থিসরাস সাহায্য করে। কাছাকাছি অর্থের বিভিন্ন শব্দের মধ্যে যে সামান্য বা সূক্ষ্ম পার্থক্য (shades of difference) থাকে, তা বুঝতে সাহায্য করাই একটি ভালো থিসরাসের মূল উদ্দেশ্য।
নতুন শব্দ মনে রাখার কিছু কার্যকর কৌশল :
শব্দ মনে রাখার কোনো একটি ধরাবাঁধা নিয়ম নেই; বরং আপনার জন্য যেটি সবচেয়ে ভালো কাজ করে, সেটিই আপনার জন্য সেরা পদ্ধতি। নিচে নতুন শব্দ মনে রাখার কিছু জনপ্রিয় ও সফল কৌশল উল্লেখ দেওয়া হলো—
- নেমোনিক (Mnemonics):
নেমোনিক হলো মনে রাখার একটি সহজ কৌশল বা বুদ্ধি। কোনো জটিল তথ্য বা বানানকে পরিচিত কোনো ছন্দ, শব্দ বা মজার বাক্যের সাথে যুক্ত করে দিলে তা সহজে মনে থাকে। আমাদের মস্তিষ্ক ছন্দ ও প্যাটার্ন দ্রুত ধরতে পারে, তাই ছড়া বা ছোট গল্পের মাধ্যমে শব্দ শেখা বেশ কার্যকর।
- দৃশ্যকল্প বা কাল্পনিক ছবি :
শব্দের অর্থের সাথে মিল রেখে মনে মনে একটি স্পষ্ট ও অদ্ভুত ছবি কল্পনা করুন। ছবিটি যত বেশি মজার বা পাগলাটে হবে, সেটি মনে থাকার সম্ভাবনা তত বাড়বে। যেমন: ‘Abridge’ (সংক্ষিপ্ত করা) শব্দটি মনে রাখতে এমন একটি সেতুর ছবি কল্পনা করুন যা মাঝখান থেকে কেটে ছোট করে দেওয়া হয়েছে। এটি নিছক বানানের চেয়ে অর্থ মনে রাখতে বেশি সাহায্য করে।
- শব্দের মূল বা ব্যুৎপত্তি (Etymology):
ইংরেজি ভাষার অনেক শব্দই নির্দিষ্ট কিছু মূল (root) থেকে এসেছে। একটি মূল শব্দ বা ধাতুর অর্থ জানলে তার সাথে সম্পর্কিত অনেকগুলো শব্দের অর্থ সহজে আয়ত্ত করা যায়। তবে এ ক্ষেত্রে সতর্ক থাকতে হবে, কারণ একই রকম দেখতে সব শব্দের উৎস সবসময় এক হয় না।
- লেখার মাধ্যমে শেখা :
কোনো কিছু কেবল পড়া বা শোনার চেয়ে নিজ হাতে লিখলে তা মস্তিষ্কে দ্রুত গেঁথে যায়। নতুন শব্দ দিয়ে নিজের মতো করে বাক্য তৈরি করা, ছবি আঁকা বা ডায়াগ্রাম তৈরি করলে শেখার প্রক্রিয়াটি আরও দৃঢ় হয়। এতে হাতের স্পর্শ ও চোখের দেখা—উভয় ইন্দ্রিয়ই কাজে লাগে।
- ফ্ল্যাশকার্ড ও নোটবুক :
ছোট কার্ডের একপাশে শব্দ এবং অন্যপাশে তার অর্থ লিখে বারবার চর্চা করাকে ফ্ল্যাশকার্ড পদ্ধতি বলে। এটি শেখার বিষয়টিকে অনেকটা খেলার মতো আনন্দদায়ক করে তোলে। এছাড়া একটি ডায়েরি বা নোটবুক রাখা ভালো, যেখানে নতুন শেখা শব্দগুলোর বাস্তব প্রয়োগ ও উদাহরণ লিখে রাখা যায়। এটি আপনার শেখার অগ্রগতির একটি দৃশ্যমান প্রমাণ হিসেবে কাজ করবে।
নতুন শব্দ মনে রাখার জন্য Princeton Review-এর ‘Word Smart’ বইয়ে বর্ণিত ধাপগুলো নিচে ছক আকারে তুলে ধরা হলো :
|
Context থেকে অর্থ বোঝার চেষ্টা ডিকশনারিতে দেওয়া মূল অর্থের পাশাপাশি এর অপ্রধান বা অন্যান্য অর্থগুলোও একবার দেখে নিন। এতে শব্দটির প্রয়োগ সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা তৈরি হবে। |
|
⬇️ |
|
ডিকশনারিতে শব্দটি দেখা অনুমান সঠিক কি না তা নিশ্চিত হতে অবশ্যই ডিকশনারি দেখুন। |
|
⬇️ |
|
শব্দটির বানান খেয়াল করা শব্দটির বানান ভালোভাবে লক্ষ্য করুন। চোখ বন্ধ করে বানানটি মনে করার চেষ্টা করুন। পরিচিত অন্য শব্দের বানানের সাথে এর মিল খুঁজুন। |
|
⬇️ |
|
উচ্চস্বরে শব্দটি উচ্চারণ করা শব্দটি জোরে জোরে উচ্চারণ করুন। কানে শুনলে শব্দটি মস্তিষ্কে দ্রুত গেঁথে যায় এবং ভুল উচ্চারণের ভয় থাকে না। |
|
⬇️ |
|
শব্দটির সব ধরনের অর্থ পড়া ডিকশনারিতে দেওয়া মূল অর্থের পাশাপাশি এর অপ্রধান বা অন্যান্য অর্থগুলোও একবার দেখে নিন। এতে শব্দটির প্রয়োগ সম্পর্কে আরও ভালো ধারণা তৈরি হবে। |
|
⬇️ |
|
সমার্থক শব্দের সাথে শব্দটির তুলনা শব্দটির সমার্থক শব্দগুলোর (Synonyms) সাথে এর ব্যবহারের পার্থক্য বোঝার চেষ্টা করুন। |
|
⬇️ |
|
নিজের ভাষায় শব্দটির সংজ্ঞা দেওয়া কোনো শব্দ আপনি তখনই প্রকৃত অর্থে শিখবেন, যখন আপনি সেটি বইয়ের ভাষা বাদ দিয়ে নিজের মতো করে ব্যাখ্যা করতে পারবেন। |
|
⬇️ |
|
শব্দটি দিয়ে বাক্য তৈরি করা শব্দটি দিয়ে নিজের মতো বাক্য তৈরি করুন। আপনার পরিচিত কোনো ব্যক্তি বা বাস্তব কোনো ঘটনার সাথে মিলিয়ে বাক্য বানালে তা দ্রুত মনে থাকে। |
|
⬇️ |
|
নেমোনিক ব্যবহার করা শব্দটিকে মনে রাখার জন্য কোনো মজার ছন্দ, মানসিক ছবি বা Mnemonic এর সাহায্য নিন। |
|
⬇️ |
|
ফ্ল্যাশকার্ড বা নোটবুক তৈরি নতুন শব্দগুলো একটি নোটবুক বা ফ্ল্যাশকার্ডে লিখে রাখুন। অল্প সময়ে অনেক শব্দ শিখতে চাইলে এর বিকল্প নেই। |
|
⬇️ |
|
নিয়মিত ব্যবহার নতুন শেখা শব্দটি সুযোগ পেলেই কথা বলা বা লেখার মধ্যে ব্যবহার করুন। চর্চা না থাকলে যেকোনো শিক্ষাই ম্লান হয়ে যায়। |
শেষ কিছু পরামর্শ :
নতুন শব্দ শেখার পাশাপাশি অতি পরিচিত শব্দের ক্ষেত্রে আমাদের যথেষ্ট সতর্ক থাকতে হবে। অনেক সময় আমরা কোনো শব্দের ভুল অর্থ বা ভুল প্রয়োগ নিয়ে বড় ধরনের বিভ্রান্তিতে পড়ি, যা পরবর্তী সময়ে বিব্রতকর পরিস্থিতির জন্ম দিতে পারে। তাই অতি আত্মবিশ্বাসী না হয়ে প্রতিটি শব্দই একবার যাচাই করে নেওয়া বুদ্ধিমানের কাজ। আর মনে রাখবেন, শব্দভাণ্ডার বাড়ানোর মূল মন্ত্র হলো ধারাবাহিকতা; একদিনে অনেক শব্দ মুখস্থ করার চেয়ে প্রতিদিন অল্প অল্প করে শেখাই সবচেয়ে কার্যকর পদ্ধতি।
আপনার এই শেখার প্রক্রিয়াকে আরও সুসংহত এবং আনন্দদায়ক করতে দারুণ এক সঙ্গী হতে পারে ‘brritto’ অ্যাপ। Word Smart বইয়ের শব্দগুলো আপনি কতটুকু আত্মস্থ করতে পেরেছেন, তা নিয়মিত ঝালাই করে নিতে এই অ্যাপটিতে প্রতি শনি, সোম ও বুধবার দিনব্যাপী বিশেষ ‘লাইভ এক্সাম’ আয়োজন করা হয়। কার্যকর কৌশলে শব্দ শেখার পাশাপাশি নিয়মিত এই পরীক্ষাগুলোতে অংশ নেওয়া আপনার শব্দভাণ্ডারকে স্থায়ীভাবে সমৃদ্ধ করার এক চমৎকার ও আধুনিক পদ্ধতি। তাহলে আর দেরি না করে আজই ডাউনলোড করুন brritto অ্যাপ!
